গৌড় রাজ্য ছিল বাংলা অঞ্চলের প্রথম স্বাধীন রাজ্য, যার প্রতিষ্ঠাতা ও শক্তিশালী শাসক ছিলেন রাজা শশাঙ্ক , যিনি গুপ্ত সাম্রাজ্যের অধীনে সামন্ত হিসেবে শুরু করে পরে স্বাধীন হন এবং তাঁর রাজধানী ছিল কর্ণসুবর্ণ (বর্তমান মুর্শিদাবাদে)। শশাঙ্ক সমগ্র বাংলা অঞ্চলকে একত্রিত করে একটি শক্তিশালী সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন, যা বাংলার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, এবং তিনি হর্ষবর্ধনের সমসাময়িক ছিলেন।
শশাঙ্ক প্রথম গৌড়ে রাজ্য স্থাপন করেন। শশাঙ্কের ধর্ম ছিল- শৈব। তিনি ছিলেন প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে প্রথম সার্বভৌম নৃপতি রাজা । গুপ্তদের অধীনে বড় অঞ্চলের শাসকদের পদবি ছিল- মহাসামন্ত। শশাঙ্কের রাজধানীর নাম- কর্ণসুবর্ণ (মুর্শিদাবাদে অবস্থিত)। শশাঙ্ক ছিলেন গুপ্ত রাজা মহাসেনগুপ্তের একজন মহাসামন্ত অথবা ভ্রাতুষ্পুত্র। হিউয়েন সাঙ রাজা শশাঙ্ককে বৌদ্ধ ধর্মের নিগ্রহকারী হিসেবে অভিহিত করেছেন। শশাঙ্ক মৃত্যুবরণ করেন- ৬৩৭ খ্রিস্টাব্দের দিকে ।
প্রথম স্বাধীন রাজা: শশাঙ্ক ছিলেন প্রাচীন বাংলার প্রথম স্বাধীন ও সার্বভৌম রাজা।
রাজত্বকাল: তিনি আনুমানিক ৫৯০/৬০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ৬২৫/৬৩৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত গৌড় রাজত্ব করেন।
রাজধানী: তাঁর রাজধানীর নাম ছিল কর্ণসুবর্ণ, যা বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলায় অবস্থিত।
পূর্বপরিচয়: শশাঙ্ক প্রথম জীবনে পরবর্তী গুপ্ত বংশের রাজা মহাসেনগুপ্তের একজন মহাসামন্ত ছিলেন।
গৌড়তন্ত্র: তিনি বাংলার একটি শক্তিশালী শাসনব্যবস্থা বা রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলেন, যা ইতিহাসে 'গৌড়তন্ত্র' নামে পরিচিত।
ধর্মীয় পরিচয়: শশাঙ্ক অত্যন্ত গোঁড়া শৈব (শিবের উপাসক) ছিলেন।
বৌদ্ধ বিদ্বেষ: চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ এবং হর্ষবর্ধনের সভাকবি বাণভট্ট তাঁদের লেখায় শশাঙ্ককে বৌদ্ধধর্মের নিগ্রহকারী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এমনকি তিনি বুদ্ধগয়ার 'বোধিবৃক্ষ' উপড়ে ফেলেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রধান শত্রু ও যুদ্ধ: তিনি কনৌজের মৌখরী রাজা গ্রহবর্মনকে হত্যা করেন।
তিনি থানেশ্বরের রাজা এবং হর্ষবর্ধনের ভাই রাজ্যবর্ধনকে হত্যা করেন।
হর্ষবর্ধন তাঁর ভাইয়ের হত্যার প্রতিশোধ নিতে শশাঙ্কের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন।
বঙ্গাব্দ প্রবর্তন: অনেক ঐতিহাসিকের মতে, শশাঙ্ক তাঁর সিংহাসন আরোহণের দিন থেকে বঙ্গাব্দ বা বাংলা নববর্ষ গণনা শুরু করেন।
মুদ্রা: তিনি স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা প্রচলন করেন, যা 'দিনার' নামে পরিচিত ছিল। তাঁর মুদ্রায় শিব ও ষাঁড়ের প্রতিকৃতি থাকত
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
মাৎস্যন্যায় (Matsyanyayam)
শশাঙ্কের পর দীর্ঘদিন বাংলায় কোনো যোগ্য শাসক ছিলনা। ফলে রাজ্যে বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা দেখা দেয়। কেন্দ্রীয় শাসন শক্তভাবে ধরার মত কেউ ছিলনা। সামন্ত রাজারা প্রত্যেকেই বাংলার রাজা হওয়ার কল্পনায় অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে থাকেন। এ অরাজকতাপূর্ণ সময় (৭ম-৮ম শতক) কে পাল তাম্র শাসনে আখ্যায়িত করা হয়েছে 'মাৎস্যন্যায়' বলে। সন্ধ্যাকর নন্দীর 'রামচরিতম' কাব্যেও পাল বংশের অব্যবহিত পূর্ববর্তী সময়ের বাংলার নৈরাজ্যকর অবস্থাকে মাৎসন্যায়ম্ বলে উল্লেখ করা হয়। পুকুরে বড় মাছগুলো শক্তির দাপটে ছোট মাছ ধরে ধরে খেয়ে ফেলার বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিকে বলে 'মাৎস্যন্যায়'। বাংলার সবল অধিপতিরা এমনি করে ছোট ছোট অঞ্চলগুলোকে গ্রাস করেছিল।
শশাঙ্কের মৃত্যুর পর বাংলার ইতিহাসে প্রায় ১০০ বছর (সপ্তম-অষ্টম শতক) ধরে এক দুর্যোগপূর্ণ অন্ধকারময় যুগের সূচনা সময়কালকে মাৎস্যন্যায় বলা হয়। বাংলার অরাজকতার সময়কালকে পাল তাম্রশাসনে আখ্যায়িত করা হয়েছে মাৎস্যন্যায়। পুকুরে বড় মাছ ছোট মাছকে ধরে গিলে ফেলার মতো বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিকে বলে মাৎস্যন্যায়। এ অরাজকতার যুগ চলে একশ বছরব্যাপী। অষ্টম শতকের মাঝামাঝি এ অরাজকতার অবসান ঘটে পাল রাজত্বের উত্থানের মধ্য দিয়ে। [তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় (দশম শ্রেণী)]
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
হর্ষবর্ধনের রাজত্বকালের চীনা বৌদ্ধ পণ্ডিত হিউয়েন সাঙ ভারত সফরে আসেন। হিউয়েন সাঙ নালন্দা মহাবিহারের অধ্যক্ষ শীলভদ্রের কাছে ১৪ বছর বৌদ্ধ ধর্মশাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। হিউয়েন সাত সিন্ধি নামে এক গ্রন্থ রচনা করেন। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন অধ্যাপক নাগার্জুন, আর্যদেব, শীলভদ্র, ধর্মপাল। হিউয়েন সাত রাজা শশাঙ্ককে বৌদ্ধধর্ম বিদ্বেষী বলে আখ্যায়িত করেন। সভাকবি বানভী হর্ষবর্ধনের জীবনীমূলক গ্রন্থ 'হর্ষচরিত' রচনা করেন।
হর্ষবর্ধন (৬০৬ - ৬৪৭ খ্রি.) পুষ্যভূতি বংশের শ্রেষ্ঠ রাজা। হর্ষবর্ধনের সভাকবি ছিলেন বানভট্ট। বানভট্টের বিখ্যাত গ্রন্থ 'হর্ষচরিত'।
Read more